পিছনে না ছোটা একজন ইরফান খান Ahmed Imran Halimi

স্টারডমের পিছনে না ছোটা একজন ইরফান খান

চারিত্রিক অভিনেতা, বলতে আমরা যা বুঝি , সাধারণত “আকর্ষণীয়” চেহারা অনুসারে সিনেমা জগতে ভাবা হয়। সেরা চলচ্চিত্র পরিচালকরা অভিনেতার গভীরতা, রস, চারিত্রিক দৃঢ়তা দিয়ে তাঁর সৃজনশীলতা যাচাই করে। ইরফান খান একজন অতুলনীয় চারিত্রিক অভিনেতা ছিলেন। বলিউডের শীর্ষস্থানে তাঁর অবস্থান কখনোই ছিল না; হলিউড সিনেমাতেও একজন ভারতীয় হিসেবে দেখিয়েছেন নিজের দাপট, সাধারণ থেকে ইরফান খান ( Irrfan Khan ) হওয়ার শিল্পকে তিনি নিখুঁত ভাবে করে দেখিয়েছিলেন।

এক সাক্ষাত্কারে ইরফান খান বলেন “আমি গল্প বলতে ও সিনেমা করতে এই ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছি এবং আমি টেলিভিশনে ঢুকে যাই।” জি এবং স্টার প্লাস নেটওয়ার্ক এর ডেইলি সোপ দিয়ে তাঁর অভিনয় জীবন শুরু হয়, যেখানে “আমার প্রথম নাটকে তারা আমাকে কোনো পারিশ্রমিকও দেয়নি কারণ তারা আমার অভিনয়কে খুবই নগন্য হিসেবে বিবেচনা করেছিল।” তারপরে খান হঠাৎ ফিচার-ফিল্মের অভিনয় করেন। এরপর থেকে আমরা ইরফানের উত্থান দেখি।

ইরফান খানের উত্থান
ইরফান

ইরফান খানের উত্থান

খান জয়পুরে এক গ্রমে মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মায়ের দিক দিয়ে সে রাজকীয় বংশের উত্তরাধিকারী এবং তাঁর বাবার দিকটি বেশ ভাল ছিল, তবে তিনি একজন আত্ন নির্ভররশীল মানুষ ছিলেন। তাঁর টায়ারের দোকান ছিল কিন্তু নেশায় তিনি শিকারী ছিল। তার বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের বড় সন্তান ইরফা খান ড্রামা স্কুল ছেড়ে দিয়ে পারিবারিক ব্যবসাতে যুক্ত হন। প্রথমে তাঁর ইচ্ছে ছিল ক্রিকেটার হওয়ার, তারপরে তিনি ব্যবসা করার চেষ্টা করেন, তবে খুব দ্রুতই ব্যবসায়িক জীবনে বিরক্ত হয়ে পড়েন তিনি। কেউ কল্পনাও করতে পারে নি, ইরফান খান পুরোদস্তুর চারিত্রিক অভিনেতা হবেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি খুব লাজুক ছিলেন। তবে ইচ্ছে ছিল। তাঁর ইচ্ছা এত তীব্র ছিল যে, নাটক স্কুলে ভর্তি হয়েই ছাড়েন।

ইরফানের নিজস্বতা

ইরফান কখনই এমন সিনেমায় অভিনয় করতে চাননি, যেখানে মানুষ তার চেহারা বা স্টাইলের প্রেমে পড়ে যায়। এটি আমার মনে কখনোই সায় দেয়নি। ক্যারিশমা অর্জনের চেয়ে মানুষের হৃদয় অর্জনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন ইরফান। বলিউডী নান্দনিকতা রক্ষার্থে ও বিশেষ চরিত্রের জন্যে অনেক তারকাদের শরীর ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে। ভারতীয় বাদামী শরীরকে বড় স্ক্রিনের প্রয়োজনে ব্লিচ করে সাদা করতে হয়েছে। শাহরুখ খান, দীপিকা পাডুকোন, প্রীতি জিনতার মত মেগাস্টারদেরও একই অবস্থা দিয়ে যেতে হয়েছিল।

তাঁর বাদামী রঙ্গা শরীর নিয়ে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন কিনা, এ ব্যাপারে তিনি বলেন- “আমিও এটি করার চেষ্টা করেছিলাম তবে আমাকে ভিতর থেকে সায় দেয় নি। আমি এমন কাজ করতে পারি না যা আমার সাথে যায় না। প্রথমদিকে আমি সব চেষ্টা করেছিলাম। তবে আমি আমার প্লাস পয়েন্ট দিয়ে লড়াই করার চেষ্টা করে গেছি। জিমে যাওয়া আমাকে কখনোই আকর্ষণ করেনি।  আমি গল্প দিয়ে সাথে সংযুক্ত হতে চেয়েছি এবং শ্রোতাদের হৃদয়ে বলিউডের ক্যারিশমা ছাড়া অন্য উপায়ে আঘাত করতে চেয়েছি। “

বলিউডকে ইরফান যেভাবে দেখেছেন

ইরফান সর্বদা বলিউড শব্দের প্রতি আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর কাছে মনে হয়েছে বলিউড শব্দটি হলিউড নামকরণের একটি চোরাইরূপ। তাঁর কাছে বলিউড মানেই ছিল উদযাপন। “আমরা সব কিছুই এখানে উদযাপন করি এবং ভারতীয় সিনেমার সম্প্রসারিত অর্থই এটি, তবে কেন আমরা নিজেদের ‘বলিউড’ বলে পরিচয় হারিয়ে ফেলল?”

“আমি হিন্দি চলচ্চিত্রকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখি, এখানে আমি শিল্পকলার সংযোগ খুব একটা পাই না। হিন্দি চলচ্চিত্রে আপনাকে  বিনোদন দিতে হবে, আপনি দর্শকদের ভাবনাদায়ক কোনো সিনেমা খাওয়াতে পারবেন না, দর্শকরা “Thoughtful” সিনেমা দেখার অভ্যস্ত না এখানে। দর্শকরা একটি আবেগের সংযোগ চায়। আপনি যদি কোনও ডার্ক ফিল্ম দেখান যা দর্শককে বিরক্ত করে, তারা এটা গ্রহণ করবে না। যদি এটি ট্র্যাজেডি হয়, তবে তারা পছন্দ করবে। তারা ইমোশনাল হতে ভালবাসে। আমি যখন কোনও স্ক্রিপ্ট পড়ি তখন প্রথমে দেখি স্ক্রিপ্টে আবেগের যোগসূত্র আছে কিনা।”

ইরফান খান সর্বদা জীবনে একটি চিহ্ন তৈরির জন্য তার সংগ্রামকে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি কখনই কোনও ভূমিকাকে তুচ্ছ হিসাবে বিবেচনা করেন নি বরং সকল রকম চরিত্রেই তিনি তেজস্ক্রিয়তা যুক্ত করতে পেরেছিলেন।

প্রতিভাধর ইরফান

ইরফান খানের প্রতিভা সম্বন্ধে বলার কোনো অবকাশ নেই। ক্যারিশমার পিছনে না ছুটে তিনি ছুটেছেন চরিত্র নির্মাণের প্রতি। তাঁর স্বাক্ষর তিনি রেখেছেন হলিউডেও। তাঁর অভিনীত একটি স্কুল নাটক, নয়াদিল্লি এবং পরে মুম্বাইয়ে সবার নজর কেড়েছিল। সম্ভবত খুব কম অভিনেতাই তাঁর মতোন অ্যাকশন, থিয়েটার, অ্যাভেন্ট গার্ড সিনেমা, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সিনেমা, বিজ্ঞাপন-টিভি সিরিয়াল এবং শর্ট ফিল্ম সমস্ত মাধ্যমেই অভিনয় করেছেন।

ইরফানের সেরা চলচ্চিত্র
ইরফান খানের সেরা তিন চলচ্চিত্র

ভারতের পর আন্তর্জাতিক অর্জন

ইরফান খান তাঁর দুর্দান্ত অভিনয় দক্ষতার জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিলেন। বিশেষত তাঁর দ্য ওয়ারিয়র্স, লাইফ অব পাই; মিতা; স্লামডগ মিলিওনিয়ার। এর মধ্যে দুটি অস্কার জয়ী সিনেমা। এছাড়াও তিনি “জাভেদ হাসান” চরিত্রে বাংলাদেশের মোস্তফা সরওয়ার ফারুকীর “ডুব” সিনেমাতেও কাজ করেছেন। আরও জানুন, উইকিপিডিয়া

পুরষ্কার

তিনি তাঁর চলচ্চিত্র জীবনে অনেক পুরষ্কার জিতেছেন- পদ্মশ্রী, দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার, দুটি ফিল্ম ফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস ইত্যাদি। দ্য লাঞ্চ বক্স, হিন্দী মিডিয়াম, লাইফ ইন আ মেট্রো, হাসিল ইত্যাদি চলচ্চিত্রে সেরা অভিনেতা, সেরা অভিনেতা(ক্রিটিকস), সাপোর্টিং রোল ইত্যাদি পর্যায়ে পুরষ্কৃত হয়েছেন।

সব মিলিয়ে, তিনি তার অর্জনে সর্বদাই খুশি থাকতে ভালবেসেছেন। নিজের অভিনয়ের প্রতি আত্মবিশ্বাস, যা প্রায়শই অভিনেতাদের মধ্যে পাওয়া যায় না, যত সফলই হোক না কেন। ইরফান স্টারডমের প্রতি কখনোই লোভ করেননি। তিনি কোনোরকম খ্যাতি ছাড়াই নিজের জীবনকে উপভোগ করতে চেয়েছেন …এবং… সেটি পেরেছেনও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *